Future of eCommerce Business in Bangladesh- Part 01

eCommerce in Bangladesh

এই পোস্ট টি Debazit Datta স্যার এর অনুমতি নিয়ে ই-ক্যাব গ্রুপ থেকে সংগৃহীত। যেহেতু ফেসবুক এ ২/৩ দিনের আগের পোস্ট খুজে পাউয়া খুবই মুশকিল তাই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস!

 

বাংলাদেশে (ও বাংলাদেশী) অনলাইন বিজনেসের ভবিষ্যৎ

পর্ব ১:
ব্লগ বিজনেস, ইউটিউব বিজনেস, ফ্রীলান্সিং বিজনেস ও সবশেষে বর্তমানে ই-কমার্স বিজনেস- বাংলাদেশে অনলাইন বিজনেসের এই কয়টি রূপের সাথে সকলেই পরিচিত। অতীত ইতিহাস (ব্লগ, ইউটিউব, ফ্রীলান্সিং) পর্যালোচনা করলে খুব স্পষ্ট যে, অনলাইন বিজনেসে বাংলাদেশ ভয়াবহ রকম দুর্দশাগ্রস্ত। ব্লগ আর ইউটিউব বিজনেস ডিগবাজি খেয়েছে আর ফ্রীলান্সিং এ সাকসেস রেট ০.০০১% এর চেয়েও কম। অথচ ব্যাঙের ছাতার মতো ইনস্টিটিউট আর ট্রেনিং সেন্টার গড়ে উঠেছিল। লক্ষ লক্ষ উৎসাহী জনতা হাজার হাজার টাকা খরচ করে ট্রেনিং নিয়ে ফ্রীলান্সিং পেশায় ঝাঁপিয়ে পড়লো, আর আজকে “অনলাইন ইনকাম” , “আউটসোর্সিং” এই শব্দগুলি শুনলে থুথু ফেলে।


এই সময়ের সহজ ও বিশাল লাভজনক অধ্যায়ের নাম “ই-কমার্স বিজনেস”। কোনো পড়াশুনা লাগে না, কোনো বড় অংকের টাকা লাগে না, কোনো প্ল্যান, পলিসি লাগে না, কোনো শপ লাগে না, অর্থাৎ একেবারে শূন্য হস্তে শুরু করে আমাজান আলিবাবা হওয়া যায় ! এই মুহূর্তে বাংলাদেশে এক হাজার ই কমার্স ওয়েবসাইট ও দশ হাজার ফেসবুক পেজ ভিত্তিক অনলাইন বিজনেস রমরমা গতিতে এগিয়ে চলছে (সংখ্যা তথ্যসূত্র: ই-ক্যাব গ্রূপ)। আগামী দিনগুলিতে আরো কয়েক লক্ষ পেজ ও ওয়েবসাইট হতে পারে, অতীতের পর্যবেক্ষণ থেকে তাই আশা করছি। তাহলে এই ই-কমার্স ঝড় (?) এর ভবিষ্যৎ কি ? এ নিয়ে আমার আজকের আলোচনা।
আমি আজকে বিজনেস গ্রোথ নিয়ে আলোচনা করবো আর সাথে সাথে বাংলাদেশের এই অনলাইন বিজনেসগুলোর ভয়াবহ ফাঁকফোকর আর দেখাদেখি বিজনেসের ভয়াবহ পরিণতির বিষয়গুলো তুলে ধরবো।


যেকোনো বিজনেস তিনভাবে বড় ও প্রসারিত হয় :
১) কাস্টমার সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে
২) মাথাপিছু কাস্টমার প্রতি এভারেজ ট্রানজেকশন বৃদ্ধির মাধ্যমে
৩) কাস্টমারদের রিপিট কেনাকাটা করানোর মাধ্যমে
শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বব্যাপী স্মল (এমনকি মাল্টি মিলিয়ন ইনভেস্ট ওয়ালাও ) বিজনেসগুলো মার্ খায় যে কারণগুলোতে তা হলো : বিজনেস মডেল তৈরিতে ব্যর্থতা, রেভেনিউ মডেল তৈরিতে ব্যর্থতা, প্রোডাক্ট অফার জনিত ব্যর্থতা কিংবা স্কেল ও মেজারমেন্ট জনিত ব্যর্থতা। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই বিজনেসম্যানদের অভিযোগ “কাস্টমার নাই ” , “কেউ প্রোডাক্ট কিনে না ” “ট্রাফিক নাই ” এই সব অজুহাত স্কলাররা স্বীকার করে না এবং এই ব্যাপারে যথাযথ প্রমান দেখিয়ে দেয়।


বিজনেস গ্রোথ মডেলের ৭ টি গুরুত্বপূর্ণ ইলিমেন্ট:
১) মার্কেট রিসার্চ
২) ট্রাফিক সোর্স
৩) অফারিং লিড ম্যাগনেট
৪) অফারিং ফ্রীবি
৫) অফারিং কোর প্রোডাক্ট
৬) অফারিং প্রফিট অপটিমাইজার
৭) এস্টাবলিশিং রিটার্ন পাথ


গ্রোথ মডেল ১: মার্কেট রিসার্চ

বিজনেস মডেল বা বিজনেস গ্রোথ বা প্রফিট ক্ল্যারিটি শুরু হয় – মার্কেট রিসার্চ শুরুর মাধ্যমে। দুঃখের বিষয় হলো : বাংলাদেশের কোনো একটা সিঙ্গেল অনলাইন বিজনেসও মার্কেট রিসার্চ করে মাঠে নামেনি। (আমি এই দাবিটি করছি এবং এর স্বপক্ষে যথাযথ যুক্তি তুলে ধরবো। যারা আমার এই দাবি চ্যালেঞ্জ করতে চান, যথাযথ তথ্য প্রমানসহ বক্তব্য উপস্থাপন করুন)। মার্কেট রিসার্চ মানে হলো- আপনার আপকামিং প্রোডাক্ট এর মার্কেট কতটা ফিট ? এর চাহিদা কেমন ? এর বাস্তবতা কি? আর এই মার্কেট রিসার্চের ৪ টি উপাদান : ১) কম্পিটিটর রিসার্চ ২) কাস্টমার রিসার্চ ৩) ফানেল রিসার্চ ও ৪) এড রিসার্চ। এই ৪ টি কাজ করতে কমপক্ষে কয়েক মাস ও কয়েকশত অনলাইন টুলস (বোথ পেইড এন্ড ফ্রি) ইউজ করতে হয়। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পাকাপোক্ত ভিত্তি তৈরী করতে হয় যাতে মাঠে নামার পূর্বেই লাভ ক্ষতির একুরেট হিসাব ভবিষ্যৎবাণী করা যায় এবং তা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়।
আর হুজুগে পরে যদি “মার্কেট ফিট” তৈরী করা হয় তাহলে তার ভবিষ্যত কি, তার একটা নমুনা : কিছুদিন আগে যখন অনলাইন ফ্রীলান্সিং ব্যাপক ভাইরাল হয়, তখন কতিপয় বাংলাদেশী ব্যক্তিও দেশে একটা আপওয়ার্ক টাইপ ফ্রীলান্সিং প্লাটফর্ম তৈরী করার চিন্তা করেন এবং তা বাস্তবে রূপ দেন। কিন্তু এটার বর্তমান অবস্থা কি ? কেউ কি জানেন? যেখানে এখন আপওয়ার্ক-ই নাই, সেখানে বাংলাদেশী আপওয়ার্ক !


বাংলাদেশে আমরা কিভাবে অনলাইন বিজনেস শুরু করছি তার কিছু নমুনা :
১) আমি এই গ্রূপে নতুন। ভাবছি আলতা সুনু পাউডার দিয়ে অনলাইন শুরু করবো। কে কে পাইকারি দরে দিতে পারবেন, কমেন্টস করুন লিংক সহ।
২) আমার কাছে টাকা নাই। ভাবছি কমিশনভিত্তিক প্রোডাক্ট সেল করবো। প্রোডাক্ট অর্ডার হলে আপনার কাছ থেকে এনে কাস্টমারকে দিবো আর বিক্রি হলে পার্সেন্টিজ দিবেন। কে কে কমিশনে প্রোডাক্ট দিতে পারবেন জানান।
৩) ভাই , আমি অনলাইনে ঘোড়ার ডিম্ বিক্রি করতে চাই। আপনারা কে কে খুচরা বা পাইকারি দিতে পারবেন, বলেন।
৪) সবাই তো সবকিছু দিয়া শুরু কইরা ফালাইছে। আমি কি দিয়া শুরু করি ? ওকে, নো প্রব্লেম, পাইছি, কেউ কেরোসিন তেল দিয়া শুরু করেনি, আমার প্রোডাক্ট হিট হবেই। আপনাদের কার কার কেরোসিন পাইকারি বা খুচরা লাগবে ?
৫) যারা মার্কেট প্লেস শুরু করেছেন তাদের আহ্বান :

আমরা আমাদের সাইটে মার্চেন্ট অপশন চালু করেছি। যারা আমাদের সাথে সেলার হিসেবে প্রোডাক্ট বিক্রি করতে চান, কমেন্ট করুন বা এই ইমেইল এ ডিটেইলস সেন্ড করুন। আমরা রিভিউ করে আপনাকে কল করবো।
এই হলো বাংলাদেশের অনলাইন বিজনেসের (ব্যক্তি বা সামষ্টিক) শুরু যেভাবে হয় তার হাল হকিকত । আমরা সবসময়-ই বিশ্ব থেকে একধাপ এগিয়ে এবং নতুনত্ব এ বিশ্বাসী। ওয়ার্ল্ড টপ স্কলারদের বুদ্ধি, পরামর্শ কেন আমরা নিবো ? আমরা আমাদের তৈরিকৃত আইডিয়া দিয়ে শুরু করবো কারণ আমরা উদ্যোক্তা ( উদ্ভট কর্তা !)।


প্রোডাক্ট মার্কেট রিসার্চের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো : “লাইফ ইজ বেটার”। অর্থাৎ, আপনার প্রোডাক্ট/ সার্ভিস কিভাবে কাস্টমারদের জীবন উন্নত করবে সেই বিষয়ে বিশেষ নজর দেয়া। এক্সিস্টিং প্রোডাক্ট/সার্ভিসে কাস্টমাররা হ্যাপি নয়, তারা অতৃপ্ত, বিরক্ত, অসুখী, পীড়াগ্রস্ত, আতঙ্কগ্রস্ত ইত্যাদি। আর আপনার প্রোডাক্ট পেলে কাস্টমাররা এই সব সমস্যা থেকে চিরমুক্তি পাবে, সেইভাবে আপনার প্রোডাক্ট/সার্ভিস তৈরী করবেন ও হাইয়েস্ট কুয়ালিটি প্রদান করবেন যাতে তারা পূর্বের পেইনফুল এক্সপেরিয়েন্স থেকে ওয়াও (অত্যন্ত হ্যাপি) হতে পারে।


স্মল বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন অনুযায়ী ৯৫% বিজনেস শুরু হওয়ার ৫ বছরের মধ্যে হারিয়ে যায় তার মস্ত বড়ো কারণ হলো : অধিকাংশ বিজনেসম্যান জানে না, তার প্রোডাক্ট/ সার্ভিসের ক্রেতা কে? অর্থাৎ, বিজনেস শুরু হওয়ার আগে মার্কেট রিসার্চ করা হয়নি। আর এর ফলে কার কাছে কি অফার করতে যাচ্ছে , তা জানে না। কি মেসেজ (মার্কেটিং) প্রদান করবে তাও জানে না। ট্রাফিক টেম্পারেচার না জেনে আন্দাজেই আবোল তাবোল মার্কেটিং করে বারোটা বাজানো, ইত্যাদি বহু সমস্যায় জর্জরিত থেকে কোনো রকমে আশায় আশায় দিন কাটাতে থাকে। একসময় ৩-৪ বছর পরে চরম বিরক্তি ও হতাশায় বিজনেস গুটিয়ে নেয়। বাংলাদেশে ব্লগিং, আর আউটসোর্সিং বিজনেসের (ট্রেনিং দাতা ও গ্রহীতা উভয়পক্ষ) এই বেহাল দশার আর অন্য কোনো কারণ নাই।
এভারেজ মার্কেটাররা বিজ্ঞাপনে শুধু আর্টিকুলেট করে, কাস্টমাররা কি পেতে যাচ্ছে। আর গ্রেট মার্কেটাররা আর্টিকুলেট করে, কাস্টমারদের মাঝে এই প্রোডাক্ট কি ফীল করাবে, তাদের এভারেজ দিনগুলো কিভাবে যাবে, আর তাদের স্ট্যাটাসের কি পরিবর্তন ঘটবে।
তাহলে সারমর্ম হলো : যে বিজনেসের ভ্যালু নাই, সেটা বেশিদিন টিকে না।

গ্রোথ মডেল ২: ট্রাফিক সোর্স

আগেই বলেছি, ট্রাফিক ইজ নো ওয়ে এ প্রব্লেম। একটা প্রব্লেম আলোচনা করেছি – “মার্কেট ফিট“। আর অন্য প্রব্লেমগুলো আলোচনায় আসবে যথাসময়ে।
অনলাইন বিজনেসের ট্রাফিক সোর্সগুলো হলো: গুগল, সোশ্যাল সাইটস (ইউটিউব, ফেসবুক ও অন্যান্য ) ,ইমেইল মার্কেটিং, ব্যানার এডভার্টাইজিং, ব্লগিং, অর্গানিক সোশ্যাল মিডিয়া, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন ইত্যাদি। এছাড়া আরো বহু ফ্রি ও পেইড টুল রয়েছে যারা আপনার সাইটে ট্রাফিক এনে দিবে।
এত্ত এত্ত ট্রাফিক থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ অনলাইন বিজনেস সম্পূর্ণরূপে ফেসবুক নির্ভর। শুধু তাই নয়, হাতে গোনা ১-২ টি সাইট ছাড়া টপ টু বটম সব অনলাইন বিজনেসের মূল ট্রাফিক সোর্স হল ” ফেসবুক বুস্ট “। বুস্ট বাদে ফেসবুকের আরো অনেক ডায়নামিক বিজ্ঞাপন ফিচার রয়েছে, কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, বড় বড় মার্কেটপ্লেস, ইক্যাব অথরিটি পার্সন যাদের ই-কমার্স বিজনেস রয়েছে, ছোট বড় সকলের মূল ও একমাত্র বিজ্ঞাপন ফিচার হলো : ফেসবুক বুস্ট। ওয়েবসাইটে ট্রাফিক নিতে না পেরে বুস্ট বিজ্ঞাপন দিয়ে ফেসবুকেই অর্ডার গ্রহণ, কনফার্মেশন করা হয়। এক্ষেত্রে, বিজনেসম্যানদের বক্তব্য হচ্ছে-

১) ওয়েব কনভার্সন বিজ্ঞাপনে মানুষ ওয়েবসাইটে যায় না।

২) মানুষ ফ্রি ফেসবুক ইউজ করে, তাই ওয়েবসাইটে গেলে এমবি ডাটা কাটবে, তাই কেউ যায় না। তাই বুস্ট ছাড়া আর কোনো উপায় নাই। এইরকম আরো কতগুলো অজুহাত রেডি আছে। কিন্তু আসলেই কি এটা মূল কারণ ? আমার এই আলোচনার শেষ পর্যন্ত পড়তে থাকুন (বেশ কয়েকটি পর্বে ধারাবাহিকভাবে এই আলোচনা চলবে, তাই প্রতিদিনের আপডেট মিস করবেন না )।
এক্ষেত্রে বিজনেসম্যানদের আর একটি বক্তব্য খুব স্পষ্ট : সেল আসলেই হল। ওয়েব কনভার্শন এ সেল আসে না, বুস্ট করেই যদি সেল আসে তাহলে ক্ষতি কি ? হ্যা, আমাদের একমাত্র লক্ষ্য: সেল জেনারেট করা।
আমার প্রশ্ন হলো : তাহলে ওয়েবসাইট করেছেন কেন? ওয়েবসাইটে ট্রাফিক না নিতে পেরে ফেসবুকে বুস্ট করে সেল করছেন, আপনি কি সফল নাকি ব্যর্থ ? এটা কি ছোটোখাটো ব্যর্থতা নাকি এর পরিনাম খুব ভয়াবহ ? ওয়েবসাইট না করে ফেসবুক দিয়েই বিজনেস চালিয়ে যেতে পারতেন, শুধু শুধু ওয়েবসাইট করলেন কেন? বরং, আপনার (যাদের ওয়েবসাইট আছে ) চেয়ে ফেসবুক ব্যবসায়ীরা এগিয়ে আছে এবং তারা সফল। তাই নয় কি?
বিশ্বব্যাপী আর কোনো দেশে “বুস্ট নির্ভর” ই-কমার্স বিজনেস নাই (১-২ টা ব্যতিক্রম নিয়ে উদাহরণ দিবেন না )। বিশ্বব্যাপী আর কোনো দেশে ফেসবুক “ওয়ান ও অনলি ” কেনাকাটার মাধ্যম নয়। বরং ফেসবুক হচ্ছে, সেলস ফানেলের ইনিশিয়াল স্টেপ। কিন্তু বাংলাদেশে এটা ইনিশিয়াল, ফাইনাল, চরম, সবকিছু।


প্রশ্ন হতে পারে, বুস্ট এ কি প্রব্লেম ? উত্তর খুব-ই সোজা : বুস্টিং এ আপনার বিজনেস ভ্যালু এস্টাব্লিশ হয় না। যেখানে আপনার বিজনেস প্রোডাক্ট/সার্ভিসের ভ্যালু-ই উপস্থাপন করতে পারছেন না, সেখানে ডেইলি হাজার হাজার কাস্টমার পেলেও (বুস্ট করে) এই বিজনেসের কি আসে যায় ? বুস্ট করে কোর অফার প্রদান করতে পারবেন না। প্রফিট অপটিমাইজার অফার করতে পারবেন না। বুস্টিং এ অনেক সীমাবদ্ধতা। আর বুস্টিং কোনো বিজ্ঞাপন নয়। এটা তাদের জন্যই করা হয়েছে যারা ফেসবুক বিজ্ঞাপনের টেকনিক্যাল সাইডে ব-কলম। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা কি দেখি ? এই এক বুস্ট নির্ভর পুরো ই কমার্স ইন্ডাস্ট্রি, শত শত ই কমার্স প্লাটফর্ম হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। অজস্র ফেসবুক এডভার্টাইজার ও এজেন্সি তৈরী হয়ে গেছে এই বুস্টিং কেন্দ্রিক। মনে রাখবেন, যে জিনিস যত সস্তায় পাওয়া যায়, তার স্থায়িত্বও ততই কম। অতীতে ফ্রীলান্সিং ট্রেনিং এ তাই হয়েছে। মাত্র হাজার ১২-১৫ টাকা দিলেই আর তথাকথিত ট্রেনিং সেন্টারে নাম লিখলেই ফ্রীলান্সিং করে লক্ষ লক্ষ টাকা ইনকাম করা যায় ! আপওয়ার্ক এ এক্সাম ট্রেনিং দাতারাই দিয়ে দিবে। সবকিছু রেডি করে দিবে। আপনি শুধু বিড করবেন আর ইনকাম করতে থাকবেন ! এর পরিণতি কি হলো ? বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।


গ্রোথ মডেল ৩: অফারিং লিড ম্যাগনেট

মানে কি? ইয়েস, কিছু একটা অফার করবেন, একদম ফ্রি তে অথবা নামমাত্র মূল্যে। কাকে? নতুন আগন্তুক, নিউ ভিজিটর, স্ট্র্যাঞ্জার, যে এই প্রথম আপনার সাইটে এসেছে, যে জীবনে প্রথম আপনার বিজনেস ব্র্যান্ড এর নাম শুনেছে । বিজনেস টার্মিনোলোজিতে একে বলা হয় “কোল্ড ট্রাফিক”। যাকে অফার করবেন তার নাম ঠিকানা তো লাগবে, তাই না? নাম ঠিকানা এমনি এমনি দিবে নাকি? মহামূল্যবান কোনো কিছু যদি একদম ফ্রীতে বা নামমাত্র মূল্যে দেন, তাহলেই আপনার সাইটে আগন্তুক ব্যক্তিটি তার নাম ও ইমেইল এড্রেস দিবে। আর এই মহামূল্যবান বস্তুটি দেয়ার জন্য আপনার সাইটে যে পরিবেশ তৈরী করেছেন, তার নাম লিড ম্যাগনেট। তাহলে সংজ্ঞাটি কি দাঁড়ালো: নতুন আগন্তুক ব্যক্তির কন্টাক্ট ইনফরমেশন পাওয়ার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান (হাইয়েস্ট ভ্যালু, টপমোস্ট কুয়ালিটি) যা প্রদান করছেন, যেই বস্তুটি গ্রহণ না করে ভিজিটর সাইট পরিত্যাগ করবে না, সেই বস্তুটির নাম লিড ম্যাগনেট। অর্থাৎ আপনার লস দিয়ে (বেশি দামের প্রোডাক্ট নামমাত্র মূল্যে) আগন্তুক ব্যক্তিকে কাস্টমারে কনভার্ট করছেন।


এর ফলে কি হলো ? আগন্তুক ব্যক্তিটি হারিয়ে গেলো না। তার কন্টাক্ট ইনফরমেশন আপনার কাছে রয়ে গেলো। আর সেই ব্যক্তিটি পেলো মূল্যবান বস্তু নামমাত্র মূল্যে। যেহেতু আপনি হাইয়েস্ট কুয়ালিটি ও টপমোস্ট ভ্যালুড প্রোডাক্ট দিয়েছেন, ডেলিভারির ক্ষেত্রে টপমোস্ট ইন্টিগ্রেটি দেখিয়েছেন, পরবর্তীতে এই ব্যক্তি আপনার কাছ থেকেই কোর প্রোডাক্ট কেনাকাটা করবে। আর তাই সর্বোচ্চ খেয়াল রাখবেন ” ইউ আর প্রোভাইডিং ট্রিমেন্ডাস ভ্যালু উইথ দ্যা লিড ম্যাগনেট “।
এই লিড ম্যাগনেট বুস্ট করে ফেসবুকে দেয়া যায় না। তা দিতে হয় ওয়েবসাইটে, যাকে বলা হয় ল্যান্ডিং পেইজ বা স্কুইজ পেইজ যার বিশেষ বৈশিষ্ট হচ্ছে : কোল্ড ট্রাফিককে লিড এ কনভার্ট করা।


লিড ম্যাগনেট এর অস্তিত্ব লিড বৃদ্ধি করার জন্য। এটা হল সেলস ফানেলের টপ ও ফার্স্ট স্টেপ। আর এর বিশেষ বৈশিষ্ট হলো স্পেসিফিসিটি অর্থাৎ স্পেসিফিক সলিউশন অফ এ স্পেসিফিক প্রব্লেম। স্পেসিফিক প্রব্লেম ও তার সমাধান যত বেশি লেজার ফোকাসিং করতে পারবেন, তত বেশি লিড্স্ পাবেন।
এই বিষয়ে বাংলাদেশের ই-কমার্স সাইটগুলোর অবস্থা খুব-ই শোচনীয়। আমি ইক্যাব গ্রূপের ৫৭৫ টি সাইট চষে বেড়াইছি। এছাড়া সমস্ত নামিদামি ছোট বড় সাইট, মার্কেট প্লেস সব বহুবার ঘুরেছি। উদ্দেশ্য : ওয়েবসাইট অডিট। যা শুরু হয়েছে কে কিভাবে লিড ম্যাগনেট উপস্থাপন করেছে তা জানা। কি জানলাম: হাতে গোনা ৩-৪ টি সাইট এ লিড ম্যাগনেট উপস্থাপন হয়েছে। টপ লেভেলের মার্কেটপ্লেসগুলোর একটাতেও লিড ম্যাগনেট নাই।
লিড ম্যাগনেট এর পিচ্চি ভাই “অপ্ট ইন ফর্ম ” আছে কিছু সাইটে। আর অপ্ট ইন ফর্ম এর ভ্যালুলেস উপস্থাপন আছে প্রায় সব সাইটে। সেটা কি ? “সাইন আপ ফর ইমেইল নিউজলেটার”। তাও অতো সহজে ভিজিটরদের চোখে পড়বে না। আমি তো ইনভেস্টিগেশন চোখে ভিজিট করেছি, তাই অনেক কষ্ট করে খুঁজে বের করেছি। ম্যাক্সিমামদের উপস্থাপনা : সাইন আপ ফর নিউজলেটার, এর নিচে ইমেইল সাইন আপ বক্স। আর কিছু না। এই ফর্ম দিয়ে একটা সিঙ্গেল লোক ও পাবেনা। হুদাই দিতে হয়, তাই দিয়ে রাখছে। আমি আরো কিউরিয়াস হলাম। অজ্ঞাত ইমেইল (এবিসিডি@জিমেইলডটকম) দিয়ে সাইন আপ করলাম। দেখতে চাইলাম, থ্যাঙ্ক ইউ পেইজ এ আমাকে কিভাবে থ্যাংক ইউ দেয়। অবস্থা খুব-ই ভয়াবহ। যা বুঝলাম, এটা এমনিতেই দিয়ে রাখছে। কাজের কিছু না। ভিজিটরদের ইমেইল এড্রেস এর গুরুত্ব নাই কারো কাছে কারণ “বুস্টিং করেই তো সেল আসতেছে !” কি দরকার এইসব ঝামেলার, তাই না?
এবার আরো কিউরিয়াস হলাম। আমার প্রাইমারি ইমেইল এড্রেস দিয়ে সাইন আপ করলাম। উদ্দেশ্য : আমাকে কি মেইল পাঠায় তা জানা ও এনালাইসিস করা। এইবার চরম আপসেট হলাম। অধিকাংশ সাইট থেকে- নো কনফার্মেশন মেইল, নো থ্যাংক ইউ মেইল। সাইন আপ করার পর ওই জায়গাতেই পপ আপ: থ্যাংক ইউ ফর সাইন আপ। আর অল্প যে কয়েকটা ইমেইল কনফার্মেশন পেলাম, জাস্ট লেখা :”ক্লিক দ্যা লিংক বিলো ফর কনফার্মেশন”, নাথিং এলস। এই হলো আমাদের ই কমাসের এর ভয়াবহ অবস্থা। বলবেন, বাংলাদেশে ই-কমার্স তো এখনো বাচ্চা। ভবিষ্যতে সব-ই হবে। গ্যারান্টি দিয়ে বলে রাখছি: ভবিষ্যতেও পারবেন না।


এখন আসুন, যে ৩-৪ টা সাইটে লিড ম্যাগনেট উপস্থাপন হয়েছে, তাদের এনালাইসিস করি। আবারো মনে করিয়ে দেই: লিড ম্যাগনেটের উদ্দেশ্য : আগন্তুক একটা সিঙ্গেল ব্যক্তিও যেন আমার সাইটে সাইন আপ না করে সাইট ছেড়ে না যায়, এটা নিশ্চিত করা। আর সেটা করা হয়: আগন্তুক ব্যক্তির মস্ত বড় সমস্যা আর তার সুপার ডুপার সমাধান দেয়ার মাধ্যমে। টেকনিক্যালি এই কাজটা করা হয় সাধারণত সাইট এক্সিট সময়ে অথবা সাইটে ঢুকার সময়েও কেউ কেউ করে থাকেন। এই পুরো কাজটি করা হয় “পপ আপ উইন্ডো” এর মাধ্যমে। বিদেশে বহু সাইট আপনি ভিজিট করেছেন, যখনি সাইট থেকে এক্সিট করছেন, ঠিক সেই সময়ে একটা পপ আপ বাক্স এসে হাজির, আপনাকে বলতেছে, ভাই একটু থামেন, এই নেন, আপনার জন্য বিশেষ কিছু একদম ফ্রীতে। পেতে চাইলে এখনই সাইন আপ করুন। আপনিও সাথে সাথে সাইন আপ করেন, আর মুহূর্তের মধ্যেই আপনার ইনবক্সে গিফট হাজির।


বাংলাদেশে যে ৩-৪ টা সাইট এ এই লিড ম্যাগনেট আছে, উপস্থাপনা এইরকম : “এই ভাই, কি যান ? এখনই সাইন আপ করেন আর সাথে সাথে ৪০০ টাকার ভাউচার পান”। ওহ মাই গড, কি অবস্থা ভাই, মানুষ কি এই ৪০০ টাকার ভাউচার পাওয়ার জন্য সাইন করবে? ৪০০ টাকার ভিখারি নাকি তারা? লিড ম্যাগনেট এর উদ্দেশ্য কি ? “স্পেসিফিক সলিউশন অফ এ স্পেফিক প্রব্লেম উইথ হাইয়েস্ট কুয়ালিটি এন্ড টপমোস্ট ভ্যালুড প্রোডাক্ট উইথ ডেলিভারি বাই টোটাল ইন্টিগ্রিটি “। আর আপনি কি দিচ্ছেন ? ৪০০ টাকার সাইন আপ। কি উদ্দেশ্যে কি করছেন ? দেখাদেখি শিখেছেন: বিদেশের সাইটে এমন করে, আমিও করি, তাই তো ? ঘোড়ার ডিমের মার্কেটিং শিখেছেন ? আপনি বাসায় রেজার বা ব্লেড দিয়ে সেভ করেন, আপনার ৫-৬ বছরের বাচ্চাটি এটা দেখেছে, আপনার অনুপস্থিতে সেও এটা শুরু করলো। কার পরিণতি কি? আপনার পরিণতি : ডিসেন্ট ভদ্রলোক। আর বাচ্চার পরিণতি : সোজা হাসপাতাল !
আমি এখানেই থামি নাই। আমার মেইল ইনবক্স চেক করলাম, ৪০০ টাকার ভাউচার পাওয়ার জন্য। মেইল চেক করে আমার কপালে হাত ! লেখা আছে : ৪০০ টাকার ভাউচার পেতে হলে কমপক্ষে ২০০০ টাকার কেনাকাটা করতে হবে।


হইছে ভাই, বাংলাদেশের টপ লেভেলের ই কমার্স সাইট কর্তৃপক্ষ যদি দেখাদেখি বিজনেস করে ও শিখে, তাহলে আমজনতার কি অবস্থা, সহজেই অনুমেয়।
বিজনেস গ্রোথ এর প্রথম পন্থাটি কি ছিল? কাস্টমার সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে। এইসব লিড ম্যাগনেট এ কোনো একজন আগন্তুক ব্যক্তির কাস্টমারে কনভার্ট হওয়ার সম্ভাবনা কত পার্সেন্ট? আর যাদের লিড ম্যাগনেট-ই নাই, যারা সাইটে আগন্তুক ব্যক্তিদের কন্টাক্ট ইনফরমেশন কালেক্ট করার জন্য আপ্যায়ন করে না, তাদের কি অবস্থা হবে?
হ্যা , উত্তর রেডি, “বুস্ট মামা আছে না ! “


আপনার বাড়িতে মেহমান আসলে একটু আদর আপ্যায়ন, স্বাদর সম্ভাষণ, ভালো ভালো নরম গরম খাবার দেন তো ? যেদিন চলে যাবে, যাতে আর একটা দিন (আর একটা বেলা, আর একটা ঘন্টা ) থাকে, সেইজন্য কোনো অফার দেন কিনা? কেউ বিকালে চলে যেতে চাইলে এই রকম অফার দেন কি: চলো আজ রাতে বসুন্ধরায় ব্লকবাস্টার, সাথে হৈচৈ মাস্তি, সেলফি আর রাতে এসে নিজেরা মিলেমিশে বিরিয়ানী রান্না করবো ইত্যাদি। সো , আজ যাওয়া হবে না। কাল সকালে যেও। নাকি বলেন, খাড়াও, তোমারে “বুস্ট” করতাছি, যাতে কাল সকালে যাইবা। কি চমৎকার মোটিভেশন ! আর আপনার ওয়েবসাইটে যারা আসে যায়, কি ঘোড়ার ডিম্ অফার করেন তাদের? কিচ্ছু না। আগন্তুক ব্যক্তিরা নিজেদের ইচ্ছায় (বা আপনার ফেসবুক বিজ্ঞাপন এ ক্লিক করে ) ওয়েবসাইটে আসে। কোনো আদর আপ্যায়ন পায় না। তাই পরে আর ফিরেও তাকায় না। আর আপনার ও এই ব্যাপারে “নো হেডেক “, বুস্ট মামা আছে না !
যেখানে ২০০০ টাকার প্রোডাক্ট মাত্র ২০০ টাকায় দেয়ার কথা (একর্ডিং টু ডেফিনিশন অফ লিড ম্যাগনেট), সেখানে এই ভয়াবহ অবস্থা বাংলাদেশের অনলাইন বিজনেসম্যানদের। এর কারণ একটাই, কেউ যথাযথ ট্রেনিং নেয় নাই। দেখাদেখি বিজনেস করছে। তার ফলশ্রুতিতে, বিদেশী সাইটগুলো কোন পরিস্থিতিতে কি করছে এবং কিভাবে উত্তরোত্তর গ্রোয়িং বিজনেস করছে, তা অজানাই থাকছে আর আমাদের দশা কিছুদিন পর এইরকম: “কেইমু এখন দারাজের সাথে মিল্ল্যা আরো ডায়নামিক বিজনেস করবে ! “


এই টপিকের উপর ধারাবাহিকভাবে আরো কয়েকটি পর্ব আলোচনা করবো। আলোচনাটি পজিটিভলি গ্রহণ করে নিজের বিজনেসের ইম্প্রোভ করতে পারলেই আলোচনা স্বার্থক। কোনো পয়েন্ট এ অমিল থাকলে যথাযথ যুক্তি সহ বক্তব্য উপস্থাপন করুন। (বস্তিবাসীদের মতো যুক্তিবিহীন ঝগড়া থেকে বিরত থাকুন)
আগামী দিন : ৭০%-৮০% ছাড়, ফ্ল্যাশ সেল, ১০-২০% ছাড়, ২ তা কিনলে ডেলিভারি চার্জ ফ্রি , এইসব ছাড়ের মূল মেকানিজম, রহস্য, সায়েন্টিফিক ব্যাখ্যা, যথাযথ প্রয়োগ আর বাংলাদেশে আমরা এইসব যা করছি (দেখাদেখি) তার ভবিষ্যৎ

ধন্যবাদ
দেবজিৎ দত্ত
এসিস্টেন্ট প্রফেসর, আই.ইউ.বি.এ.টি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।

বাংলাদেশে (ও বাংলাদেশী) অনলাইন বিজনেসের ভবিষ্যৎ- পার্ট ২ পরতে এখানে ভিসিট করুন। 

 

Leave a Reply